বাংলাদেশ ও আমার সেই ভালো লাগার অনুভূতি

0
194

ঠিক যে মুহূর্তে পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করল, আমি তখন ছিলাম বেতকা নামের একটি জায়গায়। বেতকা জায়গাটি মুন্সিগঞ্জে, সেখানে আমার বাড়ি। তবে ঠিক বিজয়ের মুহূর্তটি নিয়ে আলোচনার আগে একটু পেছন ফিরে তাকাতে চাই।
একাত্তরের উত্তাল সময়ে সুকান্তের কবিতার মতো টগবগে িছলাম আমি। মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ছটফট করতাম। আমি এবং আমাদের ২৩ জনের মুক্তিযোদ্ধা দলটির যুদ্ধকালীন কমান্ড এরিয়া ছিল মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের কিছু অংশ। সেখানে আমাদের পরিচয় ছিল ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’। আমরা ভারতের তেজপুরে প্রশিক্ষণ নিয়েছি এবং মুক্তিযুদ্ধ করেছি স্বাধীনতা অর্জনের মুহূর্ত পর্যন্ত। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলাম আমরা। সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ জন ছিলাম। মণি সিংহ, মোজাফফর আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মঞ্জুরুল আহসান খান, কামরুল আহসান খান, ইয়াফেস ওসমানসহ আরও অনেকেই ছিলেন। এই মুহূর্তে সবার নাম হয়তো মনে পড়ছে না।
২৩ জনের ছোট গেরিলা দলে বিভক্ত হয়ে আমরা যুদ্ধ করেছি ২ নম্বর সেক্টরে। যতটা মনে পড়ছে, আমার সঙ্গে ছিলেন আবু মুসা মুহম্মদ হাসান, বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডে আছেন; আরও ছিলেন লোকমান, তিনি এখন আর আমাদের মাঝে নেই। মনে পড়ছে ডা. আমানুল্লাহর কথা, এখন তিনি থাকেন ধানমন্ডিতে, প্রায় প্রতিদিনই দেখা হয় আমাদের। আমার আরও কয়েকজন সহযোদ্ধা রফিক ও কবির। রফিক এখন শিক্ষকতা করছেন, আর কবির কাপড়ের ব্যবসায় ব্যস্ত।
যাহোক, ১৩ ডিসেম্বর প্রথম আমরা ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হই এবং আঁচ করতে পারি, সম্ভবত পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। কিন্তু তখনো এ বিষয়টি ছিল ঘোর অনিশ্চয়তায় ঢাকা। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন প্রকৃতিতে ছিল মিহি কুয়াশা। সেই কুয়াশায়ই যেন আবৃত ছিল আত্মসমর্পণের বিষয়টি। ১৪ ডিসেম্বর সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হয়, এবং ১৫ ডিসেম্বর দুপুরের দিকে মোটামুটি নিশ্চিত হই যে আমরা আমাদের একটি ভূখণ্ড, একটি লাল-সবুজ পতাকা এবং একটি জাতীয় সংগীত পেতে যাচ্ছি। যদিও ঘটনাটি কখন ঘটবে, কোথায় ঘটবে—সে বিষয়ে তখনো কোনো প্রকার ধারণা করা যাচ্ছিল না। কিন্তু ঘটনা যে ঘটবেই তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আর রইল না।
অতঃপর ১৬ তারিখ বিকেলে আমরা খবর পেলাম, পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের অধিনায়ক লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজি সাদা কাগজে লিখে দিয়েছেন: সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের অদম্য আকাঙ্ক্ষার সামনে আমরা আত্মসমর্পণ করলাম। যদিও ঠিক এই বাক্যটি তিনি লেখেননি, কিন্তু আমি মনে করি নিয়াজির আত্মসমর্পণ দলিলে দস্তখত করার অর্থ এটিই দাঁড়ায়। তো, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সেই বিকেলে আমরা অনুভব করলাম, পৃথিবীর মানচিত্র থেকে পূর্ব পাকিস্তান নামটি মুছে গেছে চিরতরে। আমরাই প্রাণ আর সম্ভ্রমের ভয়ংকর সুন্দর মুছনি দিয়ে ঘষে ঘষে তুলে ফেলেছি ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামটি। একই সঙ্গে গাঢ় লাল আর গাঢ় সবুজে লিখেছি নতুন একটি নাম—বাংলাদেশ। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে আমরা—আমার ধারণা শুধু আমরাই নই, প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বোপরি প্রতিটি বাঙালি একজন বিশেষ মানুষের অভাব বোধ করছিল। মানুষটি ছিলেন বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তখনো আমরা জানি না তিনি জীবিত, নাকি তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। তবে বিশ্বাস ছিল, যেহেতু পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেছে, তাহলে সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকে আমরা ফিরে পাব।
আক্ষরিক অর্থেই এক সাগর রক্ত আর অসংখ্য নারীর সম্ভ্রমের দামে অর্জিত স্বাধীনতার অনন্য সুন্দর মুহূর্তটিতে আমরা ২৩ জনের দলটি ছিলাম মুন্সিগঞ্জের আবদুল্লাহপুরে। আমরাই সেখানকার সাধারণ জনগণকে চিরদাসত্ব মুক্তির পবিত্র-সুন্দর সংবাদটি জানাই। তখন যে দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল, তা এ মুহূর্তে ব্যাখ্যা করা আদৌ কি সম্ভব! বিজয় মুহূর্তের একটি ঘটনা এখন খুব মনে পড়ছে। কিছু পাকিস্তানি আবদুল্লাহপুর ঘাটে ওদের একটি গানবোট ফেলে রেখে জীবন বুকপকেটে নিয়ে পালিয়েছিল। স্থানীয় লোকজন করল কি, সেই গানবোটে উঠে নাচতে শুরু করল। প্রচলিত ছন্দ ও প্রচল তালের বাইরে এক অনন্য অপার্থিব ছন্দে দুলে দুলে নেচেছিল সবাই সেদিন। আহা, সে কী উদ্দাম-মাতাল নৃত্য! আমার চোখে দেখা সেটিই ছিল প্রথম বিজয় উৎসব।
বিজয়ের সংবাদে কিছু মানুষ মনে হলো আনন্দে উন্মাদ হয়ে গেছে—ঘোর বরষায় ডোবার কই মাছের যে দশা উপস্থিত হয়, কতক মানুষের হলো সেই দশা। অপূর্ব মুহূর্ত ছিল সেটি! আকাশের সূর্যটিকেও মনে হচ্ছিল ঈদের কুর্তার মতো ভাঁজ ভাঙা, নতুন। ছুটে ছুটে দ্বারে দ্বারে খবর পৌঁছে দিতে লাগলাম আমরা। খবরটি অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না, ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকল আমাদের মুখে। কেউ হাউমাউ করে কাঁদল। কেউ শার্ট খুলে পতাকার মতো উড়িয়ে দিল ভোঁ দৌড়। আবার কেউ স্রেফ নির্বাক-নিষ্পলক চোখে পথের দিকে তাকাল; তার আপনজন হয়তো ফিরবে এই পথে।
সেই মুহূর্তের দারুণ একটি বিষয় ছিল এই যে কিশোর মুক্তিযোদ্ধারা নানাভাবে আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল, তারা আনন্দে রীতিমতো আত্মহারা হয়ে উঠল। হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে এর আগে তারা কখনো খেলেনি। মুক্তিযুদ্ধ তাদের সেই সুযোগ এনে দিল ৫৬ হাজার বর্গমাইল মাঠে। বাংলার কিশোরেরা খেলতে নেমে গিয়েছিল অবলীলায়। খেলার নিয়ম ছিল, মাঠে নামার আগে প্রাণ হাতের মুঠোয় নিতে হবে। বলা বাহুল্য, আমাদের কিশোরেরা প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়েই খেলেছিল নির্মম-সুন্দর সেই খেলা। খেলায় জিতে কিশোরেরা সেদিন আনন্দে পুরোপুরি দিশা হারিয়ে ফেলল। আজও চোখে ভাসে সেই আনন্দ ক্ষণ—এ তাকে জড়িয়ে ধরছে, ও লাফ দিয়ে পড়ছে পানিতে। অনেকে জোট বেঁধে ফুটপাথ ধরে ছুটছে, কোথায় ছুটছে, কেন ছুটছে, জানে না।
তবে বিজয়ের এই মাহেন্দ্র মুহূর্তে আমাদের ওপর নির্দেশ ছিল, আমরা যেন ঢাকার দিকে ধাবিত না হই। যদিও একদম ঘাট পর্যন্ত চলে এসেছিলাম, কিন্তু থামিয়ে দেওয়া হলো আমাদের। কারণ তখন সময়টা ছিল রাত এবং তখনো গোলাগুলির আশঙ্কা ছিল। কেননা, শত্রুপক্ষ তখন ছিল ফুটন্ত ভাতের মাড়ে লোম পুড়ে যাওয়া কুকুরের মতো ক্ষিপ্ত। সুতরাং আমাদের ওপর নির্দেশ এল, কোনো অবস্থাতেই যেন রাতে আমরা নদী অতিক্রম না করি।
১৭ ডিসেম্বর আবছা অন্ধকার ভোরে ছোট লঞ্চে চেপে প্রথমে এলাম নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি ফায়ার ব্রিগেডের গাড়িতে করে ঢাকায়। মনে আছে, গাড়িচালক ভদ্রলোককে অনুরোধ করতেই তিনি জয়বাংলা হাসি দিয়ে আমাদের ২৩ জনের দলটিকে তুলে নিলেন গাড়ির প্রকাণ্ড লাল পেটের মধ্যে। এরপর গাড়িটির চারদিকে দাঁড়িয়ে আমরা ২৩ জন মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীন বাতাসে চুল উড়িয়ে ঢুকে পড়লাম ঢাকায়। সেই ছিল স্বাধীন ঢাকায় আমার এবং আমাদের প্রথম পদক্ষেপ। প্রথমে আমরা আসি বায়তুল মোকাররমের এখানে। সে সময়েও পরাজিতরা, বিশেষ করে অবাঙালি এবং পাহারাদার যারা ছিল, তারা বিভ্রান্তের মতো আচমকা এদিক-সেদিক গুলি ছুড়ছিল। এমনই এক ঘটনায় ওইদিন জিপিওতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল একজন।
আমরা ২৩ জন মুক্তিযোদ্ধা, সঙ্গে আরও অনেকে যুক্ত হয়ে মিছিল করতে করতে গেলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। শহীদ মিনারের তখন কেবল সিঁড়িটিই ছিল, বাকি সব ধ্বংস করা হয়েছিল।
শহীদ মিনারে পৌঁছে দেখি মানুষ আর মানুষ। দলবেঁধে, স্লোগান দিয়ে আসছেন আরও আরও অনেকে। কিছু মানুষ কোথা থেকে যেন আমাদের জন্য নিয়ে এলেন খাবার। তখনকার পরিস্থিতিতে খাবারগুলো ছিল কিছুটা অদ্ভুত—নেতানো মুড়ি, নরম হয়ে আসা কমলা, মজে যাওয়া কলা প্রভৃতি। তিন–চার দিন ঢাকা অবরুদ্ধ থাকায় তাজা খাবারের খুব সংকট হয়েছিল সেদিন। কিন্তু সেই বাসি–মলিন খাবারগুলোই হাতে হাতে আসতে লাগল শহীদ মিনারে। আমরা কেউ একটু মুখে দিলাম, কেউ দিলাম না। কিন্তু তবে তাতে কিছু আসে যায়নি। যাঁরা খাবার এনেছিলেন তাঁরাও আনন্দিত, আর যাঁরা খেয়েছেন, আনন্দ খেলা করছিল তাঁদের চোখেমুখেও; এমনি এই খাবারগুলো যাঁরা খেলেন না, এই শ্রেণীও খুশিতে ভাসছিল তখন। এই হাসি–আনন্দ আর জনকলরবের ভেতর দিয়ে কখন যেন আমরা কয়েকজন সহযোদ্ধা শহীদ মিনারে উঠে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছি, বুঝতেই পারিনি। পরে জেনেছিলাম, আমাদের সেই মুহূর্তটি ফ্রেমবন্দী করেছিলেন কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রশিদ তালুকদার।
বিজয়ের স্মৃতি মনে এলে এমন কত কথা যে গুনগুন করে মনের মধ্যে। আদতে মানুষ তাঁর চূড়ান্ত ভালো লাগার অনুভূতি কি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে? পারে না। আমিও হয়তো আমার সেদিনের ভালো লাগার অনুভূতির সবটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারলাম না। তাতে অবশ্য কিছু আসে–যায় না, বাংলাদেশ তো পেয়েছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here