ভাইরালের নামে তাঁরা ভাইরাস ছড়াচ্ছেন: ইবরার টিপু

0
228

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের পেশাদার গানের জগতে ২৬ বছর ধরে বিচরণ ইবরার টিপুর। বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেল, নাটক-চলচ্চিত্রের গান, অডিওর গান—বাদ দেননি কোনো সেক্টর। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই মানুষটির নাম। এই সংগীত পরিচালক ও গায়ক এবার অর্নি রেকর্ডস নামে একটি সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। একই নামে ইউটিউব প্ল্যাটফর্মেও রয়েছে তাঁর অ্যাকাউন্ট। গত শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার রামপুরার একটি রেস্তোরাঁয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন তিনি। গান প্রকাশের প্রতিষ্ঠান চালুর ব্যাপারে কোন ভাবনা কাজ করেছে, তা-ই জানতে চাওয়া হয়েছিল এই গায়ক ও সংগীত পরিচালকের কাছে।
হঠাৎ করে গান প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চালুর চিন্তা মাথায় কেন এল?
গানের ব্যবসা একচেটিয়া হয়ে গেছে। কোম্পানিকে গান দেওয়ার পর তার মালিকানা শিল্পী, সুরকার, গীতিকার ও সংগীত পরিচালক, কারোরই থাকে না! এত সুন্দর করে একটা গান বানানোর পর প্রতিষ্ঠানকে লিখে দিয়ে দিতে হয়। বহু বছর ধরে এসব চলে আসছে। সংগীতাঙ্গনের এ ব্যাপারটি অনেক দিন ধরে আমাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছিল। ভাবিয়েছে। বিষয়টি মানতে আমার সমস্যা হচ্ছিল। বারবারই আমার মনে হয়েছে, কষ্ট করে গান তৈরি করে কোম্পানিকে দেওয়া সন্তান বিক্রি করে দেওয়ার মতো। তাই ভাবলাম, কষ্ট করে গান বানিয়ে অন্যকে না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেওয়াই উত্তম। তাই একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চালু করলাম, একই সঙ্গে বর্তমান সময়ের কথা ভেবে ইউটিউব প্ল্যাটফর্মও চালু করলাম। এতে আমার গানের মালিকানায় আমার পরিবারের মানুষেরাই থাকবেন। গান থেকে অল্প পাই, বেশি পাই—টাকাগুলো নিজেদের কাছ থাকল। যদিও আমার জীবনের হাজার দশেক গান যা-ই করেছি, তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সময় দিয়ে এসেছি।
এর বাইরে আর কোনো বিষয় কাজ করেছে?
আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, আমি একটা গান বানালাম। সুর ও সংগীত তৈরির পর মনে হলো, অমুক শিল্পীকে দিয়ে গানটা গাওয়ানোর। কারণ অমুক শিল্পীর কণ্ঠেই গানটি বেশি মানাবে। কিন্তু প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কারণে তা আর সম্ভব হয় না। তারা একরকম চাপিয়ে দেয়, এই শিল্পী অথবা ওই শিল্পীকে দিয়ে গাওয়াতে। শুধু তা-ই নয়, কথা আর সুর নিয়েও তারা প্রায়ই খবরদারি করে। সবই যদি প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দেয়, তাহলে আমার আর দরকার কী! বলতে পারেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর নখরামি থেকে পরিত্রাণ পেতেও নিজে প্রতিষ্ঠান চালু করেছি।
আপনার প্রতিষ্ঠান কি এই বলয় থেকে বের হতে পারবে?
আমি মনে করি, এ দেশের সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধ। এই সংস্কৃতিতে যখন রাস্তাঘাটে গিটার নিয়ে গান গাওয়া একটা ছেলে, গান শিখুক বা না-ই শিখুক, গানের বেসিক জানুক বা না-ই জানুক—তেমন কিছু মানুষ ভাইরাল হচ্ছে! সংগীতের তথাকথিত বাজার ডমিনেটও করছে, কিছু প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এদের নিয়ে মেতেও আছে—যা খুবই দুঃখজনক। আমি জোর গলায় বলতে চাই, ‘মাইয়া ও মাইয়া রে’ এই ধরনের গান কখনোই বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। যতই কোটি কোটি ভিউ হোক না কেন। বাংলাদেশের সংগীত যাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন, সেসব শিল্পীর কারোরই কোনো গান ভিউ দিয়ে টিকে থাকছে না। আর আমাদের দেশের গণমাধ্যমকে বলতে চাই, শিল্পীদের গানের ভিউ নিয়ে খবর প্রকাশ না করে, গানের মান নিয়ে কথা বলুন। যোগ্যদের নিয়ে কথা বলুন। দীর্ঘ সময় টিকে থাকার মতো কিছু গান করব, সেই ভাবনা চিন্তা আমার। আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, এখনকার বেশির ভাগ গানের স্থায়িত্ব বেশি দিন হয় না। আমি চেষ্টা করব, এসব অপবাদ আর বলয় থেকে বের হয়ে আসতে। যাঁরা সংগীত জানেন, তাঁদের নিয়ে কাজ করব। অরুচিকর কিছু ভাইরাল করে ব্যবসা করতে হবে, এমনটা আমার দরকার নেই। আমার ট্যাগলাইন হচ্ছে, সাউন্ড অব লাইফ। এই উপলব্ধিকে সঙ্গী করে আমি এগিয়ে যাব ইনশা আল্লাহ।
এই মানসিকতা কেন?
সবারই এখন আলোচনায় থাকতে হবে। যে করেই হোক ভাইরাল হতে হবে। তাই যেই-সেই কনটেন্টে ইউটিউব ভরপুর। কিন্তু আমরা কেউ বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করছি না। এই মানসিকতা আমাদের সংগীতের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কিন্তু করে দিচ্ছে। বাইরের দেশের শিল্পী ও শ্রোতারা কোনোভাবে আমাদের সৃষ্ট এসব গান শুনবেন, তখন আমাদের নিয়ে ভাববেন, আমরা হয়তো এই স্ট্যান্ডার্ডের।
আপনাকে এই পথে আসার ব্যাপারে কেউ কি সহযোগিতা করেছে?
গান দিয়ে কিন্তু এখন অনেক ধরনের ব্যবসা হয়। আমিও একটা সময় এই ভুল ভাবতাম, গানের মনে হয় আগের মতো আর ব্যবসা হয় না। এই প্রতিষ্ঠান চালু করতে গিয়ে এসব টের পেলাম নতুন করে। গানের ডিজিটাল ব্যবসার বিষয়ে জানতে অনেকের কাছে ধরনা দিয়েছি। টাকা-পয়সাও দিলাম, কিন্তু কেউ সঠিক কোনো তথ্য দিল না। শেষে নিজেই পড়াশোনা শুরু করলাম ইউটিউব নিয়ে। অনেক কিছুই জানতে পারলাম। সবকিছু আমার কাছে এখন পরিষ্কার। আমি বলব, কোনো শিল্পীরই তাঁর সৃষ্টি কাউকে দেওয়া উচিত না। গানের একেবারে খুব ছোট প্রতিষ্ঠান হলেও প্রতি মাসে তারা ভালো আয় করছে। তাই আমি বলব, প্রতিটা শিল্পীর নিজের প্রতিষ্ঠানে গান প্রকাশ করা উচিত। নিজেদের ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম রাখা উচিত।
কিন্তু গান তো প্রকাশের জন্য কোনো না কোনো কোম্পানিকে দিতেই হবে নাকি?
তা ঠিক আছে। কিন্তু ব্যবসায়িক বিষয়গুলো পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত। এককালীন কোনো প্রতিষ্ঠানকে গান দিয়ে দেওয়া উচিত হবে না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসার বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে মেনে চলা উচিত।
একজন শিল্পী একই সঙ্গে গান সৃষ্টির সঙ্গে থাকবে, আবার গান বিপণনের বিষয়েও মাথা ঘামাবে, এতে করে শিল্পচর্চা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
আমার উপলব্ধি, যাঁরা আমাদের দেশে সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন, তাঁদের বেশির ভাগ স্বত্বাধিকারী সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে আসেননি। সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও তাঁদের নেই। এ জন্যই তাঁরা সব সময় ব্যবসার কথাই বেশি ভাবেন। অনেক সময় শিল্পী নামে যাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তাঁদের অনেকেই গানের ‘গ-ও’ জানেন না। আর এখন তো ভাইরালের নামে তাঁরা ভাইরাস ছড়াচ্ছেন।
আপনার প্রতিষ্ঠান ও ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে কি শুধু আপনার গানই থাকবে?
প্রশ্নই আসে না। আমার গান যেমন থাকবে, তেমনি অন্যদেরও থাকবে। এই প্রতিষ্ঠান সবার। এখানে চুক্তি করে গান লিখিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে না। বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম মেনে কাজ করব। এখানে যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদের বেশ কিছু সুবিধা আছে। আমরা প্রায় দেখি, মেধাবী কেউ যখন গানের জগতে প্রথম কাজ করতে আসেন, নানা অসুবিধা হয়। মিউজিক করবে কোথা থেকে, গান লেখাবে কোথা থেকে, ভিডিও করবে—এই ধরনের আরও অনেক ব্যাপার আছে। এর বাইরে, মানের ব্যাপারে আবার একটা সন্দেহ থাকে। আমাদের একটাই শুধু শর্ত, গান গাওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। গান সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান থাকতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here