ভাসানচরে গেলেন আরও ১৪৬৬ রোহিঙ্গা

আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাসানচর যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। শনিবার আরও এক হাজার ৪৬৬ রোহিঙ্গা ভাসানচরে পৌঁছেছে। এ নিয়ে ভাসানচরে রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়াল ৬ হাজার ৯৯৪ জন। চতুর্থ দফায় এক হাজার ৪৬৬ রোহিঙ্গাকে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পতেঙ্গার বোটক্লাব থেকে নৌবাহিনীর চারটি জাহাজে করে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হয়। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন ও ভাসানচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাহে আলম জনকণ্ঠকে জানান, নৌবাহিনীর কমডোর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর নেতৃত্বে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে ক্লাস্টারে পুনর্বাসনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন।

 

এদিকে শনিবার থেকে একটি এনজিও রোহিঙ্গাদের শিক্ষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চালু করেছে। এছাড়া বিআরডিবির (বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) পক্ষ থেকে ২৫০ জনের ব্যাচ করে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে।

 

এর আগে ভাসানচরে স্থানান্তর করার জন্য রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের উখিয়ার ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। এদের মধ্য থেকে ভাসানচরে শুক্রবার নেয়া হয় এক হাজার ৭৭৬ জনকে। একজন মহিলা প্রসবজনিত কারণে তার শাশুড়িসহ যেতে পারেননি। শনিবার ওই মহিলাকে শিশু ও তার শাশুড়িসহ ভাসানচরে পাঠানো হয়েছে।

 

এদিকে উখিয়া টেকনাফের আশ্রয় শিবির থেকে ভাসানচরে যাওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের রীতিমতো লাইন পড়েছে। সবাই তাদের নাম রেজিস্ট্রি করার জন্য তৎপর হয়েছে। সরকার এক লাখেরও কিছু বেশি রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেয়ার জন্য ক্লাস্টার হাউস সঙ্গে আনুষঙ্গিক সকল সুযোগ-সুবিধা প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ১৩ হাজার একর জমির ওপর ১২০টি গুচ্ছগ্রামের আদলে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

 

ভাসানচরে নেয়ার আগে রোহিঙ্গাদের সেখানে না নেয়ার জন্য নানামুখী অপতৎপরতা চলেছে। বিদেশী হাতেগোনা কয়েকটি এনজিও এবং আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছে। সেখানে তাদের আরাম আয়েশে থাকার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিলেও প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। যেহেতু সাগর সংলগ্ন এটি একটি জেগে উঠা নতুন দ্বীপ, সে হিসাবে বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা এটিকে ব্যানারে এনে তাদের তৎপরতা চালিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। এখন রোহিঙ্গারা সেখানে যাওয়ার পর ভাল ব্যবস্থাপনা এবং নিশ্চয়তা পেয়ে অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করেছে। মূলত অন্যরা আশ্রয় শিবির ছেড়ে সেখানে যাওয়ার জন্য লাইন ধরেছে। আগে ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আর এখন আনন্দ উল্লাস। বিআরডিবি এসব রোহিঙ্গাদের দলে দলে বিভক্ত করে বিভিন্ন ধরনের কৃষি কাজ, মৎস্য খামার, পশু পালনসহ জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এছাড়া আগে ছিল আশ্রয় শিবিরের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। এখন তারা থাকছে নবনির্বিত ইট পাথরে গড়া দৃষ্টিনন্দন ভবনে। ফলে রোহিঙ্গাদের মনমানসিকতায়ও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে সেখানে ৪০ দেশীয় এনজিও কাজ করছে। রোহিঙ্গারা সেখানে যাওয়ার পর প্রথম তিনদিন তৈরি খাবার পরিবেশন করা হয়। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে রেশন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে রোহিঙ্গারা বেশ খুশি।

 

এদিকে ভাসানচরের প্রকল্প পরিচালক কমডোর আবদুল্লাহ আল মামুন ভাসানচর থেকে জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, আরও দফায় দফায় রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের এজেন্সি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকে। পরিবহন প্রক্রিয়াটিও অতি সহজ নয়। এছাড়া এদের আশ্রয় ক্যাম্প থেকে আনা হয় উখিয়ার আশ্রয় ক্যাম্পে। সেখান থেকে নিয়ে আসা হয় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিএফ শাহীন স্কুল সংলগ্ন এলাকায়। এরপর উঠানো হয় জাহাজে। পরে নেয়া হয় ভাসানচরে। এ কাজটি সুষ্ঠুভাবে করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা অনস্বীকার্য।

 

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবির থেকে ৩৮টি বাসে রোহিঙ্গাদের চট্টগ্রাম নেয়া হয়। রাতে চট্টগ্রাম বিএফ শাহিন কলেজ ট্রানজিট ক্যাম্পে রাখা হয়। শনিবার সকাল নয়টায় নৌবাহিনীর পাঁচটি জাহাজ তাদের নিয়ে ভাসানচরের উদ্দেশে রওনা হয়। ভাসানচরে নৌবাহিনীর দায়িত্বরত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মামুন জানান, রোহিঙ্গাদের পর্যায়ক্রমে জাহাজ থেকে নামিয়ে প্রাথমিক মেডিক্যাল পরীক্ষা শেষে গাড়িতে করে ওয়্যার হাউস-১ এ নিয়ে ব্রিফিং করা হয়। পরে ভাসানচরের ২৩, ২৪ এবং ২৫নং ক্লাস্টারে স্থানান্তর করা হয়।

গত ৪ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে আনুষ্ঠানিকভাবে নারী-পুরুষ, শিশুসহ নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে পৌঁছে এক হাজার ৬৪২ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের জন্য প্রস্তুত ৭, ৮, ৯, ১০ নম্বর ক্লাস্টারে তাদের রাখা হয়। নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এক সপ্তাহ তাদের রান্না করে খাওয়ানো হয়। প্রথম ধাপে ভাসানচরে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিশু রয়েছে ৮১০ জন, পুরুষ ৩৬৮ জন, নারী ৪৬৪ জন।

গত ২৯ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় কক্সবাজার থেকে আরও এক হাজার ৮০৪ জন রোহিঙ্গা ভাসানচরে পৌঁছায়। তাদের মধ্যে ১৩০ জনের বেশি রয়েছে প্রথম দফায় যাওয়া রোহিঙ্গাদের স্বজন। প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় মোট তিন হাজার ৪৪৬ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়।

 

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক বাসিন্দা বলেন, টেকনাফের ক্যাম্পে কাজ পাওয়া দূরের কথা, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশও ছিল না। কিন্তু ভাসানচরের পরিবেশ অনেক ভাল। আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুব ভাল আছি। কিন্তু আমরা কাজ চাই। বেকার জীবন খুব লজ্জার। লোকজনকে পরিচয় দিতে পারি না। ভাসানচর প্রশাসন বলছে, পূর্ব অভিজ্ঞতা যথেষ্ট না থাকায় এই মুহূর্তে ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের কাজে লাগানো যাচ্ছে না। মাছ ধরা ও কৃষি কাজ ছাড়া আর কিছু তারা খুব একটা জানেন না। ভাসানচরের মাটি ও কৃষি কাজের জন্য উপযুক্ত না। রোহিঙ্গাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নানা ধরনের হাতের কাজে দক্ষ করে তোলা হবে।

 

  1. ভাসানচরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কন্টিনজেন্ট কমান্ডার ইমতিয়াজ উদ্দিন মোহাম্মদ সাবির জানান, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কাজের ব্যাপক আগ্রহ আছে। আগ্রহী নারী-পুরুষের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব, যাতে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের হস্তশিল্পসহ নানা কাজে দ্রুততম সময়ে নিয়োগ করা যায়।

চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার এ্যাডমিরাল মোঃ মোজাম্মেল হক বলেন, চারটি জাহাজে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসা হয়। অন্য একটি জাহাজে করে এই রোহিঙ্গাদের মালপত্র নিয়ে আসা হয়। নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের দুটি জাহাজ ও চারটি স্পিডবোট নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গাদের বহনকারী জাহাজের সঙ্গে ছিল বলে জানান তিনি।

Author: Faruk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *