আলজাজিরা মকুমেন্টারি: কথিত ‘ব্যবসায়ী’ ফ্রিডম মোস্তফা কতটা নিরপরাধ!

৮০’র দশকে ঢাকার প্রতিটি এলাকায় বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্র ফ্রিডম পার্টির পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনী। ধানমন্ডি, মোহাম্মদুর, শাহজাহানপুর, শান্তিনগর ও মিরপুর এলাকার অলিখিত নিয়ন্ত্রণ ছিল ফ্রিডম পার্টির কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের হাতে। ফ্রিডম পার্টির ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর-মিরপুর থানার কো-অর্ডিনেটর ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা ওরফে ‘ফ্রিডম মোস্তফা’। বড় ভাই হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান ছিলেন ফ্রিডম পার্টির ঢাকা মহানগর শাখার প্রভাবশালী নেতা ও কর্নেল ফারুকের অত্যন্ত আস্থাভাজন। চাপাতি থেকে শুরু করে ছোট-বড় অস্ত্র চালানো, বোমা তৈরি ও বোমা হামলায় সিদ্ধহস্ত মোস্তফা বড় ভাই পাগলা মিজানের সুপারিশে লিবিয়ায় গাদ্দাফির বিশেষ বাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র ও গ্রেনেড নিক্ষেপে পারদর্শিতা সহ গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।

 

ফ্রিডম পার্টি কর্তৃক লিবিয়ায় গেরিলা প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরিত সন্ত্রাসীদের বাছাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন মিজান ও শাহজাহানপুরের বাহার। মোস্তফা, জর্জ ও মামুনের গ্রুপ কর্তৃক বাহারকে হত্যার পর ফ্রিডম পার্টিতে মোস্তফা ও মিজানের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ ও সৈয়দ ফারুক রহমানের ‘দেহরক্ষী’ নিযুক্ত হয় মিজানের ভাই মোস্তফা, জর্জ, মামুন ও হাজারিবাগের শামসুদ্দিন মন্টু সহ তাদের অনুগত সন্ত্রাসীরা। দুই খুনি ও তাদের পরিবারের সুরক্ষায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘নিরাপত্তা বুহ্য’।

 

ফ্রিডম পার্টিতে জর্জ-মামুন ও মানিক-মুরাদ গ্রুপের মধ্যে বৈরিতা ছিল চরমে। মিজান ও মোস্তফার উদ্যোগে দুই গ্রুপের প্রকাশ্য কোন্দল ও সংঘর্ষের অবসান ঘটে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট ফ্রিডম পার্টির প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি গ্রুপের অংশগ্রহণে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনে হামলা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়।

নিরাপত্তারক্ষী হাবিলদার জহিরুল হক ও কনস্টেবল জাকির হোসেন সহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেই হামলা প্রতিহত করে রক্ষা করেন বঙ্গবন্ধুকন্যাকে।

 

এ ঘটনার পর মোস্তফা ফ্রিডম পার্টির সবচেয়ে আস্থাভাজন সন্ত্রাসী হয়ে ওঠেন। ফারুক-রশীদের সুপারিশে বিএনপি জামায়াতের নেতাদের সঙ্গেও সখ্যতা তৈরি হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ওঠেন। মোস্তফার উদ্যোগে গাজী লিয়াকত ওরফে কালা লিয়াকত, বালু, গোলাম সারোয়ার ওরফে মামুন, সোহেল ওরফে ফ্রিডম সোহেল, জাফর আহমেদ মানিক, নাজমুল মাকসুদ মুরাদ, গাজী ইমাম হোসেন, জর্জ, সহ দেশের কুখ্যাত ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় কিলার গ্রুপ ‘বেস্ট ফিফটি’। ফ্রিডম পার্টি ও বিএনপির প্রতিপক্ষ এক এই বিবেচনায় বিএনপি নেতাদের মতোই বিভিন্ন মহলে তাকে সমীহ করা হতো। এ কারণেই সরকারের পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় নাম উঠেনি তার।

 

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, জমি দখল ও কন্ট্রাক্ট কিলিং ইত্যাদির অলিখিত লাইসেন্স যেন ছিল ফ্রিডম পার্টির কাছে। ফুটপাত ও পরিবহনে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে আবাসিক বা বাণিজ্যিক গৃহনির্মাণ বা সরকারি বেসরকারী ঠিকাদারি কাজ – এ সবকিছুতেই মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে নিতে হতো ফ্রিডম পার্টির ছাড়পত্র।

 

১৯৯৬ সালে ফ্রিডম পার্টির অপরাধ সাম্রাজ্যে ধ্বস নামে। মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজি করার বিহারী মুন্না ওরফে মাউরা মুন্না গ্রুপের সঙ্গে বাদানুবাদের সময় মোস্তফার ছোঁড়া গুলিতে নিহত হয় ভিডিও গেমস খেলারত (মুন্নার খালাতো ভাই) এক কিশোর। বিহারী ক্যাম্প থেকে ধাওয়া করলে দলবলসহ পালিয়ে যায় মোস্তফা ও মিজান। তার কিছুদিন পরই বিহারী মুন্না হত্যা করে মোস্তফাকে।

 

কাতারভিত্তিক প্রোপাগান্ডা চ্যানেল আলজাজিরা মোস্তফার কাছে লাইসেন্স করা পিস্তলে থাকার কথা বলেছে। কিন্তু মোস্তফার মত চিহ্নিত সন্ত্রীসী কিভাবে লাইসেন্স পেল সেটি উল্লেখ করে নি। তারা বেমালুম চেপে গেলো সন্ত্রাসী মুন্নার নিরপরাধ কিশোর ভাইটির নিহত হওয়ার কথা। মুন্না কর্তৃক মোস্তফার নিহত হওয়ার বিষয়টি নিয়েও মিথ্যাচার করেছে।

 

টোকাই থেকে ফ্রিডম পার্টিতে

এক সময় টোকাই ছিলেন। দেশের শীর্ষ স্থানীয় সন্ত্রাসী আর সর্বহারাদের নিয়ে কর্নেল ফারুক-রশীদ ফ্রিডম পার্টির কার্যক্রম পুরো মাত্রায় শুরু করলে সন্ত্রাসী এ দলটিতে যোগ দেন মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা। নতুন অস্ত্র আর নগদ অর্থের লোভ দেখিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই মোহাম্মদপুর এলাকায় দলীয় অবস্থান সুসংহত করেন। পুরস্কারও পান হাতেনাতে।

 

লিবিয়ায় তাকেসহ শতাধিক তরুণ-যুবককে পাঠানো হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে। দেশে ফিরে পুরোদমে বেপরোয়া হয়ে উঠেন। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর এলাকায় অপরাধের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠার পর নিজ গোত্রেই তাকে দেওয়া হয় ‘ফ্রিডম মোস্তফা’ নাম।

বরিশালের নলসিটিতে মোস্তফার সর্বহারা পার্টির দুর্ধর্ষ টিম ছিলো। এই টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন বাহার ও স্বাধীন। এছাড়া খুনোখুনি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ অনেক অপরাধেও যুক্ত ছিলেন এ মোস্তফা।

 

টিপ্পন, ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম শুভ্রতো বাইন (বর্তমানে কলকাতার আলীপুর জেলে বন্দী), সায়েদাবাদ-ফুলবাড়িয়ার কালা লিয়াকত, যিনি পরবর্তীতে নিজ দলের সন্ত্রাসীদের হাতেই প্রাণ হারিয়েছেন।

 

আলজাজিরা সিরিয়ালের কথিত ‘ব্যবসায়ী’ চরিত্র মোস্তফা আদতে অনেক অপকর্মের নায়ক। বহুবার অবৈধ অস্ত্র নিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে মিরপুর থানাতেও ওই সময় খুন, জখম, চাঁদাবাজিসহ প্রায় একডজন মামলা ছিল।

 

মোস্তফা মারা যাওয়ার দুই থেকে তিনমাস আগে ১৯৯৬ সালে লালমাটিয়া ভিডিও ক্লাবে আজাদ নামে জনৈক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদাদাবি করেন। কিন্তু কাঙ্খিত চাঁদা না পেয়ে গুলি ছুঁড়েন। এতে ক্লাবের ভেতরে ভিডিও গেমস খেলারত এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মোস্তফার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এরকম আরও অনেকের রক্তে নিজের হাত রাঙিয়েছেন মোস্তফা।

 

রাজধানীর মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের ভিপি সাঈদ আহমেদ টিপুকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত সরকারের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজেদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনের গুরুও ছিলেন ফ্রিডম মোস্তফা। ইমনকে মোস্তফাই ফ্রিডম পার্টির পদে আনেন। মোস্তফার প্রতিপক্ষ গ্রুপ ছিলো শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ ও প্রকাশ।

 

মোস্তফা হত্যা মামলার পরস্পর বিরোধী এফআইআর-অভিযোগপত্র

আন্ডারওয়ার্ল্ডের সিরিয়াল কিলার মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা ওরফে ফ্রিডম মোস্তফার মৃত্যু নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন। চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার এফআইআর (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) ও অভিযোগপত্রই একেবারে পরস্পর বিরোধী। মামলার এফআইআর’এ উল্লেখ করা হয়েছে- ‘জোসেফ মোস্তফার দুই উরুতে এবং ডান পায়ে পিস্তল দিয়ে গুলি করেন।

 

আর মাসুদ তার (মোস্তফা) বুকের দু’পাশে দু’টি গুলি করেন।’ অথচ মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তোফায়েল আহমেদ জোসেফকে ফাঁসাতে মামলার অভিযোগপত্রের তথ্য সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

ফ্রিডম মোস্তফার ডায়িং ডিক্লেয়ারেশনের ভিত্তিতেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে জোসেফ এবং অন্যদের সাজা দেওয়া হয়েছিলো। সেই জবানবন্দিতে মোস্তফার স্বাক্ষর ছিলো না। এমনকি হাতের ছাপও ছিলো না। কিন্তু বিএনপি সরকারের ম্যাজিস্ট্রেট জোড়াতালি দিয়েই সেই জবানবন্দি তৈরি করেছিলেন বলেই ঘটনা ঘটেছিল এক জায়গায় অথচ মামলায় দেখানো হয়েছে অন্য স্থানের একটি ঘটনা।

 

মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই সেই সময়কার প্রতিবাদী তারুণ্য ছাত্রলীগ নেতা জোসেফকে ‘খুনি’ এবং ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’র তকমা দিয়েছিল হাওয়া ভবন নিয়ন্ত্রিত সেই সময়কার সরকার।

 

প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা চেস্টার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই মোস্তফা। ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে শেখ হাসিনার ওপরে ফ্রিডম পার্টির ১০ থেকে ১২ জনের যে দলটি গুলি চালায়, সেটাতে নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা। ফ্রিডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরও ছিলেন এ কিলিং মিশনে।পরবর্তীতে এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা হয়। মামলা নম্বর : ২৪, ১১/০৮/৮৯। ১৯৯৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলার অভিযোগপত্র দেয়। এতে সৈয়দ ফারুক, আবদুর রশিদ ও বজলুল হুদা এবং নাজমুল মাকসুদ মুরাদসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। অভিযোগপত্রে ১৮ নম্বর আসামি মোস্তফা।

 

পরবর্তীতে ২১ বছর আগে আদালতে স্বাক্ষী হিসেবেই তার বড় ভাই পাগলা মিজানও প্রকারান্তরে জবানবন্দিতে স্বীকার করেন শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টায় নিজের ছোট ভাই মোস্তফার কাপুরুষোচিত মিশনের কথা আগে থেকেই তিনি জানতেন।

114150cookie-checkআলজাজিরা মকুমেন্টারি: কথিত ‘ব্যবসায়ী’ ফ্রিডম মোস্তফা কতটা নিরপরাধ!

Author: Faruk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *