স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় জোর

করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে (২০২১-২২) বাজেটে স্থানীয় শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। এজন্য রাজস্ব কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনা হবে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, সার, বীজ, জীবন রক্ষাকারী ওষুধসহ করোনার সুরক্ষাসামগ্রী আমদানিতে শুল্ক রেয়াতি সুবিধা বহাল রাখা হবে। কর অবকাশ সুবিধার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাও অব্যাহত থাকবে। মোটা দাগে, বাজেটে কর হার নয়, করজাল বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য পূরণের ছক আঁকা হচ্ছে। ব্যক্তি শ্রেণির রিটার্ন বৃদ্ধি, শুল্ক ফাঁকি ও বন্ডের অপব্যবহার রোধে দিকনির্দেশনা থাকবে। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

 

সূত্রগুলো জানিয়েছে, করোনাকালীন বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে বাজেটে স্থানীয় শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কর হার বাড়ানো হবে না। ২০২০-২১ অর্থবছরের করহারই বহাল রাখা হবে। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক নীতি শাখা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দেয়া প্রস্তাবনার সার-সংক্ষেপ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে। বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ভ্যাট ও কাস্টমস শাখার কর্মকর্তারা জুমে বৈঠক করেছে। রোববার অর্থমন্ত্রী আয়কর নীতির শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

 

আরও জানা গেছে, বাজেটের রূপরেখার খসড়া নিয়ে ৭ মে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে পুনরায় বৈঠক করা হবে। পরে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ১১ ও ১২ মে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসবেন অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেই বৈঠকের পরই রাজস্ব বাজেট চূড়ান্ত করা হবে। মূলত প্রধানমন্ত্রী রপ্তানিমুখী শিল্পের করপোরেট কর হার, উৎসে কর হার, প্লট-ফ্ল্যাট ও শেয়ারবাজারে কালো টাকার বিনিয়োগ, করপোরেট ট্যাক্স ও ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।

 

দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এবারের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের সমান। এবার যেহেতু আকাশচুম্বী লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়নি, তাই বাজেটে নতুন করারোপের চিন্তা থেকে সরে আসা হয়েছে। চলতি বছরের বাজেটের আদলেই হবে আগামী বাজেট। নতুন পদক্ষেপের মধ্যে স্থানীয় শিল্পকে কীভাবে কর ছাড় দিয়ে চাঙ্গা করা যায় সেই প্রয়াস থাকবে। এ জন্য কোন কোন খাতে ছাড় দেয়া যায় তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এনবিআরের বর্তমান চেয়ারম্যান মনে করেন, রপ্তানিমুখী এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সুরক্ষার মাধ্যমেই শুধু করোনাকালীন সময়ে অর্থনীতির ভিত মজবুত রাখা সম্ভব। কারণ শিল্প টিকে থাকলে উৎপাদন হবে, রপ্তানি বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মানুষের আয় বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। তাই রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি রেয়াতি সুবিধা, এইচএস কোডের জটিলতা দূর করা হবে। এজন্য আমদানি পণ্যের এইচএস কোড বিভাজন করা হবে। এছাড়া বাজেটে আয়কর রিটার্ন ও ভ্যাটের রিটার্ন জমার বৃদ্ধিতে দিক-নির্দেশনা থাকবে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশীয় শিল্পের মধ্যে ইলেকট্রনিক্স, মোটরসাইকেল, ইস্পাত, প্যাকেজিং, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নতুন করারোপ করা হবে না। পক্ষান্তরে অটোমেশন কার্যক্রম জোরদারের মাধ্যমে ব্যবসা সহজীকরণের ঊদ্যোগ থাকবে। কর আদায় বাড়াতে ভার্চুয়াল ইকোনমি, ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল ও অডিট কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। এ জন্য আয়কর আইনে নতুন ধারা যুক্ত করা হবে। সর্বোপরি আয়কর আইনকে যুগোপযোগী করে ব্যবসাবান্ধব করা হবে। পাশাপাশি বন্ডের অপব্যবহার বন্ধে অনিয়মের জরিমানা বৃদ্ধি, ভ্যাট ফাঁকি বন্ধে ইএফডি (ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস) স্থাপন ও সেগুলো মনিটরিং কর্মকর্তাদের রোস্টারভিত্তিক পদায়নের দিকনির্দেশনা থাকবে।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, শিল্পের কর হার যত কম হবে দেশে শিল্পায়ন তত বাড়বে। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। উল্টো যারা ট্যাক্স দেয় এনবিআর শুধু তাদেরই চাপ দেয়। আর যারা দেয় না তাদের খোঁজও নেয় না। দেশে ৪৬৫টি উপজেলা আছে। প্রতিটি উপজেলাতেই ৪-৫টি ব্যাংকের শাখা আছে। এসব শাখায় সর্বনিম্ন ৫শ কোটি টাকার আমানত আছে। উপজেলা পর্যায়ে আয়কর অফিস সম্প্রসারণের মাধ্যমে করযোগ্য ব্যক্তিদের করের আওতায় আনা যায়। এছাড়া ঢাকা শহরের গুলশান, বনানী, বারিধারা, মহাখালী ডিওএইচএস, উত্তরায় অনেক বাড়ি-মার্কেটের মালিকের ট্যাক্স ফাইল নেই। থাকলেও তারা প্রকৃত আয় দেখান না। এদের অনেকে ভাড়া থেকে মাসে ১০ কোটি টাকা আয় করেন। অথচ একটা শিল্প থেকে মাসে ১০ কোটি টাকা আয় করতে অন্তত ৩শ-৫শ মানুষকে খাটানো লাগে। অর্থাৎ তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে। কিন্তু দেখা যায়, এনবিআর শুধু শিল্পমালিকদের ট্যাক্সের জন্য চাপ দেয়, কিন্তু যে বসে বসে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া আয় করে তার কাছে যায় না। এটা এক ধরনের বৈষম্য। করজাল বাড়ানোর মাধ্যমে শিল্পের কর হার কমিয়ে আনলে দেশে আরও শিল্পায়ন হবে।

Author: Faruk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *