ডাক্তার সুলতানা পারভীনের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

ডা. সুলতানা পারভীন সুবর্নার মৃত্যু ঘিরে তৈরি হচ্ছে রহস্যের জট। অন্তর্বাস পরা অবস্থায় মৃতদেহ খাটে পড়ে থাকা, পাশে আলামত ছিল ৫টি প্যাথেডিনের ভায়াল, কালো ডায়েরি ও চিঠি নিয়ে উদয় হচ্ছে নানা প্রশ্নের। সব প্রশ্নের উত্তর আটকে যাচ্ছে দরজায় আটকানো সিটকানিতে। অনেকটাই গোলকধাঁধার মতো। তাহলে মেলান্দহ হাসপাতালের কোয়ার্টারের দ্বিতীয় তলায় কি ঘটেছিল সেদিন, যেখানে পড়ে ছিল ডা. সুলতানা পারভীন সুবর্নার নিথর মৃতদেহ। মানুষের মুখে মুখে চলছে আলোচনা-সমালোচনা গুঞ্জন। ঘটনার আড়ালে কি অন্য কিছু রয়েছে?

নানাদিক সামনে রেখে অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসছে নতুন নতুন তথ্য। ঘটনা মোড় নিচ্ছে ভিন্ন দিকে। পুলিশ গভীরভাবে ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে নানাদিক সামনে রেখে। চারদিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কোন ক্লু খোঁজে পায়নি। ডা. সুলতানা পারভীনের মৃত্যুর রহস্যের জাল ছিড়ে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে, শুধু একটু সময়ের অপেক্ষা।

ডা. সুলতানা পারভীন সুবর্না ভালভাসার মানুষকে বিয়ে করে সুখের সংসার সাজাতে চেয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনে সেখানেই গড়ে তুলবে ভালোবাসাময় সংসার। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বছর কয়েক আগে রাজধানীর মোহাম্মদীয়া আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের ২৮/এ নম্বর বাড়িতে ফ্লাট কিনেছিলেন। এমবিবিএস পড়ার সময় থেকেই চট্টগ্রামের খুলশী থানার হামজারবাগের সাব্বিরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সুলতানা পারভীনের। সাব্বির তখন বুয়েটের ছাত্র। সম্পর্ক থেকে বিয়ের পিড়িতে বসে দু’জন। ৫ লাখ টাকার দেনমোহর ধার্য করে বিয়ে হয় তাদের।

দাম্পত্য জীবন শুরুর কিছুদিন পর থেকেই দুজনের মধ্যে বাধে দ্বন্দ। কারণ, আরো এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ইঞ্জিনিয়ার সাব্বিরের। তাতে আবার সায় ছিল সাব্বিরের মা পরিবার পরিকল্পনার সাবেক পরিচালক শাহানা আক্তারের। কেটে যায় ৪ বছর। এর মধ্যে দুজনের ঝগড়া হয়েছে আরো অনেকবার।

যৌতুকবিহীন, প্রেমের বিয়ে মেনে নিতে পারেনি। তাই দুজনের বিচ্ছেদ ঘটাতে মাস্টারপ্লান করে সাব্বিরের মা শাহানা আক্তার। ছেলেকে পাঠিয়ে দেয় কানাডায়। কথা ছিল দু’বছর পর সুলতানা পারভীনকে কানাডায় নিয়ে যাবে সাব্বির। তাই বিশ্বাস করে এয়ারপোর্টে গিয়ে স্বামীকে বিমানে তুলে দিয়েছিলেন সুলতানা পারভীন। কিন্তু বিদেশ পাড়ি জমাবার এক বছর পর থেকে সাব্বির আর কোন যোগাযোগ রাখেনি স্ত্রীর সঙ্গে।

এদিকে সাব্বিরের পরিবারও বিষয়টি আড়াল করে। উল্টো তারাও জানিয়েছে, সাব্বিরের হদিস মিলছে না। তাই স্বামীর অপেক্ষায় সুলতানা পারভীন দুবছর শ্বশুরবাড়িতেই ছিলেন। তখন পর্যন্ত শ্বশুরকে বেতনের ২০ হাজার দিতেন ডা. পারভীন। কিন্তু তাতেও মন পায়নি তাদের। ইতোমধ্যে শ্বাশুড়ির নির্যাতনে বিষিয়ে ওঠে পারভিনের জীবন।

সাব্বিরের পরিবারের অভিযোগ, তখন থেকেই হতাশায় সুলতানা পারভীন নেশার ইনজেকশন নিতো। মাদকাশক্তে জড়িয়ে পড়ার খবর পৌঁছে পারভীনের পরিবারেও। মেয়েকে মাদকের অন্ধকার পথ থেকে ফেরাতে সুলতানা পারভীনকে শশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে নিয়ে আসে তার পরিবার।

বাবার বাড়িতে আসার পর স্বামী-শ্বাশুড়ির বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করে ডা. সুলতানা পারভীন। ওই মামলায় শ্বাশুড়ি শাহানা আক্তার গ্রেপ্তারও হয়। অবশেষে দেনমোহরের ৫ লাখের মধ্যে ৩ লাখ টাকা দিয়ে দুপক্ষে সেটেলমেন্ট হয়। কিছুদিন পরই সাব্বির ৭০ লাখ টাকার যৌতুক নিয়ে বিয়ে করে মায়ের পছন্দের চারুকলা বিভাগের সেই মেয়েকে।

এতো কিছুর পরও সাব্বিরের আশা ছাড়েনি ডা. সুলতানা পারভীন। প্রেমিক স্বামী সাব্বিরকে কাছে পেতে বিভিন্ন সময় হুমকি পর্যন্তও দিতেন। ততেক্ষণে ইঞ্জিনিয়ার সাব্বির এক সন্তানের বাবা। ওদিকে মামলাও চলতে থাকে।

রহস্যজনক কারণে ডা. পারভীন বিয়ের কথা গোপন রাখে সার্ভিসবুকে। মানিকগঞ্জের পর ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মেলান্দেহে যোগদান করেন তিনি। অল্প সময়ে প্রিয় ‘ডাক্তার আপা’ খ্যাতি পায় রোগীদের কাছ থেকে। মুখে হাসি থাকলেও ডা. সুলতানা পারভীনের বুকে চাপা ছিল বিরহের জগদ্দল পাথর। তার জীবনের অভিমান-অভিযোগ সবই লিখতেন উদ্ধার হওয়া কালো ডায়েরিতে।

গত ঈদে বাবা-মায়ের সঙ্গে আনন্দ করা হয়নি। তবে মাংস পাঠিয়েছিলেন মা। মৃত্যুর দুদিন আগে ময়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল। সুলতানা পারভীনের পরিবারের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ডা. সুলতানা পারভীনের মা রহিমা আজাদের বলেন, স্বামী সাব্বিরকে কৌশলে কানাডা পাঠানো, স্বামী বিদেশ থাকাকালীন শাশুড়ির মানসিক নির্যাতন, বিবাহ বিচ্ছেদের পর আমার মেয়ের জীবন যখন বিষিয়ে ওঠে, তখন থেকে পেথেডিন নামক ড্রাগ নেয়া শুরু করে সে।

তিনি আরো বলেন, আমার মেয়েকে যখন আমাদের বাসায় নিয়ে আসি তখন রাতদিন ‘আমার সাব্বিরকে এনে দাও বলে কান্নাকাটি করতো’। মৃত্যুর আগ পর্যন্তও সাব্বিরের অপেক্ষায় ছিল। অসম্ভব ভালবাসতো সাব্বিরকে। তবে ডিপ্রেশনে ভুগলেও আমার মেয়ে আত্মহত্যা করার মতো মানুষ নয়। খুব শক্ত মনের ছিল। আমার মেয়ের মৃত্যুর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে কিনা খতিয়ে দেখা দরকার। প্রাইভেট ক্লিনিকে প্র্যাকটিস করা নিয়ে স্থানীয় ডাক্তাররা মাঝে মাঝে হুমকি দিত বলে জানিয়েছিল।

জানা গেছে, মেলান্দহে চাকরিত অবস্থায়ও শরীরে প্যাথেডিন নিত সুলতানা পারভীন। আর তাকে প্যাথেডিন সরবরাহ করে দিত মেলান্দহ হাসপাতালের অপরদিকে মাতৃছায়া ঔষধ ফার্মেসির মালিক শাহিন। তার সাথে বিশেষ সখ্যতাও ছিল সুলতানা পারভীনের। হাসপাতাল কম্পাউন্ডের বাইরে কারো সাথে কথা না বললেও হাসপাতালে যাওয়া আসার সময় ঔষদ ব্যবসায়ী শাহীনের সাথে হাসি-ঠাট্রা করতে দেখেছে আশপাশের লোকজন।

মাতৃছায়া ঔষধ ফার্মেসের মালিক শাহিন তার সাথে সখ্যতা অস্বীকার করে বলেন, আমি তাকে প্যাথেডিন কিনে দিতাম না। প্যাথেডিন কোনদিন দেখিওনি।

একজন ঔষধ ব্যবসায়ী প্যাথেডিন চেনে না- তার কথায় প্রশ্ন থেকেই যায়।

মঙ্গলবার বিকালে মেলান্দহ থানার ওসি রেজাউল করিম খান হাসপাতাল কোয়ার্টারের অন্যন্য বাসিন্দা ও আশপাশে জিজ্ঞাসাবাদ করেন সেদিন রাতের ঘটনা নিয়ে।

এ বিষয়ে মেলান্দহ থানার ওসি রেজাউল করিম খান বলেন, যে কোয়টারে ডা. সুলতানা পারভীনের লাশ পাওয়া গেছে তার অপরদিকের কোয়ার্টারের বাসিন্দা ও আশপাশের লোকজনের সাথে কথা বলেছি, তারা সেদিনের রাতে কোন শব্দ পায়নি বা কিছু দেখেনি।

সহকারী পুলিশ সুপার সীমা রানী বলেন, ঘটনাটি আমরা খতিয়ে দেখছি। ময়নাতদন্ত রির্পোট পর বিস্তারিত বলা যাবে।

উল্লেখ্য, শনিবার (১৫ আগস্ট) জামালপুর শহরের শাহজামাল হাসপাতালে রোগী দেখে রাতে ডা. সুলতানা পারভীন কোয়ার্টারে ফেরেন। পরদিন রোববার সকালে আয়া ঘর পরিস্কার করতে গিয়ে তার কক্ষ ভেতর থেকে বন্ধ পান। বিকাল ৩টার সময় শাহজামাল হাসপাতালে তার রোগী দেখার কথা ছিল। ওই হাসপাতাল থেকে গাড়ি যায় তাকে আনতে। ড্রাইভার দরজায় নক করে অনেক ডাকাডাকির পরও শব্দ না পেয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফজলুল হককে বিষয়টি জানান।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তার পিয়ন পাঠিয়ে দেন ডাক্তার সুলতানা পারভীনকে ডাকতে। পিয়নও ডাকাককির পর দরজা না খোলায় ফিরে এসে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে জানান। তার সন্দেহ হলে মেলান্দহ থানায় বিষয়টি অবহিত করেন। বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে ডা. সুলতানা পারভীনের লাশ উদ্ধার করেন। রাতেই স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফজলুল হক বাদী হয়ে মেলান্দহ থানায় অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন।

58730cookie-checkডাক্তার সুলতানা পারভীনের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

Author: Faruk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *