ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়: প্রধানমন্ত্রী

 

ইতিহাস আসলে মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়। আজকে সেই নাম আর কেউ মুছতে পারবে না, সেই ইতিহাসও কেউ মুছতে পারবে না। এটা হচ্ছে বাস্তবতা।’

বাঙালি জাতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি মুছে ফেলতে নানা অপচেষ্টা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ইতিহাস প্রতিশোধ নেয়।’বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার স্মৃতি মুছে ফেলতে সে সময়ের সরকারগুলোর ভূমিকা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সে নাম মুছে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে।’

 

জন্মশতবার্ষিকীতে তার জাতীয় সংসদে বিশেষ অধিবেশনে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেয়া নোটিসের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে এ কথা বলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সবাইকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সোনার বাংলা গড়ে তোলাই সরকারের মূল্য লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।ছাত্র অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর জনসেবা, রাজনীতিতে যোগ দেয়া, সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য কাজ করা, ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়া, বারবার কারাবরণ, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা উত্থাপন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯ এর গণ আন্দোলন, ৭০ এর নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের পরে দেশে ফিরে দেশ গঠনের চেষ্টা, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার প্রসঙ্গ উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে।

 

সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপপ্রচার, হত্যার পর তার অবদান মুছে ফেলার চেষ্টার কথাও তুলে ধরেন জাতির জনকের বড় মেয়ে।

 

শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুর্ভাগ্য ১৯৭৫ সালে তাকে হত্যা করা হলো, কত অপবাদ দিয়ে কত মিথ্যা প্রচার চালিয়ে কত কিছু বলে। তার মৃত্যুর পরে কত রকমের মিথ্যা অপপ্রচার…

 

‘ইতিহাস আসলে মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়। আজকে সেই নাম আর কেউ মুছতে পারবে না, সেই ইতিহাসও কেউ মুছতে পারবে না। এটা হচ্ছে বাস্তবতা।’

 

বাবা হিসেবে একটানা কখনও কাছে না পাওয়ার আক্ষেপের কথাও বলেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, কারাগারে ছিলেন। আমরা তো সন্তান হিসেবে এক টানা দুই বছরও বাবাকে পাইনি। দেখা হয়েছে বন্দি কারাগারে।’

কারাগারে নানা নির্যাতন সহ্য করলেও তা কখনও সন্তানদের জানাননি বঙ্গবন্ধু।

 

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি কখনও কষ্টের কথা আমাদের বলেননি। আমার ছোট বোন জিজ্ঞেস করত। তিনি শুধু বলতেন, তুই শুনিস না, সহ্য করতে পারবি না। তাহলে আপনি বুঝতে পারেন, সেখানে কী নির্যাতনের মধ্য দিয়ে কী কষ্টের মধ্য দিয়ে তাকে দিন কাটাতে হয়েছে।’

 

১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির জনকের দেশে ফেরার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি আমাদের মাঝে ফিরে এসেছিলেন। চেয়েছিলেন বাংলাদেশটাকে গড়ে তুলবেন। … তিনি কষ্ট করে এসে যে বললেন ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, সে ঐক্যবদ্ধ তো থাকতে পারেননি।’

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭৫ সালে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু তিনি পাত্তা দেননি।

 

“ফিদেল ক্যাস্ত্রো তাকে সাবধান করেছিল। মিসেস গান্ধী তাকে বলেছিলেন, ‘একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে, সাবধান’। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বলেছিলেন, না, এরা আমার দেশের ছেলে। এরা আমার সন্তানের মতো। এরা আমাকে মারতে পারে না। আমি এদের জন্য কাজ করি, তারা আমাকে কেন মারবে’।”

 

‘কতটা বিশ্বাস এই দেশের মানুষের ওপর ছিল। …তার সেই বিশ্বাসটা বাঙালি জাতি রাখতে পারেনি। অবশ্যই এটা মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী…’-বলেন শেখ হাসিনা।

 

বিদেশে থাকায় বেঁচে যাওয়ার কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন,

 

‘আমি নিজেও তো বাংলাদেশে আসার পর বারবার মৃত্যুর মুখে পড়েছি। আমি মনে করি, আল্লাহ মানুষকে একটা কাজ দেয়। সে কাজটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বোধ হয় আল্লাহই রক্ষা করে। আমাকে রক্ষা করেছে আল্লাহ আর আমার দলের নেতা কর্মীরা। মানবপ্রাচীর তৈরি করে।’

 

দীর্ঘ বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী তার প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়েছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, লাল সবুজ পতাকা ও সংবিধান। তিনি বিশ্ব সভায় বাঙালিকে আত্মপরিচয় নিয়ে গর্বিত জাতি রূপে মাথা উঁচু করে চলার ক্ষেত্র রচনা করেছেন। স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার জন্য মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন তিনি। সেই সময়কালে বাংলাদেশের উন্নয়নের সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেন তিনি।

 

‘২০২০ সালে জন্মশতবার্ষিকীতে মুজিব শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও কর্মময় জীবন ও দর্শনের ওপর জাতীয় সংসদে বিশেষ আলোচনার মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করা হোক।’

 

এরপর সংসদ সদস্যরা বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বাঙালি জাতির জন্য তার আত্মত্যাগ নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

 

এর আগে অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মারক বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাৎও হয়।

Author: Faruk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *